BANGLA, Blog

নবজাতক শিশুর ত্বকের যত্ন কেমন হওয়া উচিৎ?

ঘরে ছোট্ট নতুন অতিথির আগমন পরিবারে সীমাহীন আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। সন্তান জন্মের পর পরই শুরু হয়ে যায় তার যত্নের নানা আয়োজন। শিশুর যত্নে তার প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে নেবার পাশাপাশি এই সময় নতুন বাবা-মা তাদের সন্তানের যত্নে ঠিক কি কি করা উচিৎ তা নিয়ে বেশ চিন্তিত থাকেন। তারা চান তাদের সেরাটা দিয়ে আদরের সন্তানকে সব সময় আগলে রাখতে। এই সময় সুস্থতার পাশাপাশি শিশুর ত্বকের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। শিশুর কোমল ত্বক বড়দের তুলনায় অনেক বেশী সংবেদনশীল। গর্ভাবস্থাতেই বাচ্চাদের ত্বকে ভার্নিক্স (Vernix Caseosa)-এক ধরনের সাদা তৈলাক্ত আস্তরণ তৈরি হয় । এতে থাকা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রোপার্টিজ শিশুদের ত্বককে বিভিন্ন ধরনের ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। ভার্নিক্সে এ একধরনের বিশেষ উপাদান থাকে যার নাম স্কোয়ালিন (Squalene) যা ত্বকে ন্যাচারাল ময়েশ্চারাইজার হিসেবে কাজ করে। তাই একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যাক্তি ত্বকের যত্নে যে ধরনের পণ্য ব্যবহার করেন তা শিশুদের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ যে ধরনের অ্যাক্টিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট ও ফ্রেগ্রেন্স বড়দের স্কিন কেয়ার প্রোডাক্টে ব্যবহার করা হয় তা শিশুদের এই ভার্নিক্স লেয়ার কে নষ্ট করে দিতে পারে। এতে স্কিনে ড্রাইনেস, র‍্যাশ ও রেডনেস সহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়।

এই সমস্যা প্রাথমিকভাবে দূর করার জন্য শিশুর যত্নে কিছু ব্যাপার খেয়াল রাখা প্রয়োজন।

  • সঠিকভাবে শিশুদের গোসল

একটি ট্রেডিশন আমাদের দেশে অনেক আগে থেকেই চলে আসছে যে, বাচ্চা জন্ম নেয়ার সাথে সাথে গোসল করিয়ে দিতে হবে। কিন্তু বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার মতে শিশু জন্মের অন্তত ২৪ ঘন্টা পরে শিশুকে গোসল করিয়ে দিতে হবে। কারণ সাথে সাথে গোসল করালে ত্বকের এই ভার্নিক্স লেয়ার ওপর থেকে ধুয়ে মুছে যায় এবং ত্বক একদম টান টান হয়ে পড়ে । তাই সপ্তাহে ২-৩ বার গোসল করালেই যথেষ্ট।

এখন বাচ্চাকে পরিষ্কার রাখতে হলে বাকি দিন গুলোতে কি করা যায় ? বাকি দিন গুলোতে শিশুকে হালকা কুসুম গরম দিয়ে হাত-পা মুছিয়ে দিবেন। এটাকে বলা হয় ‘টপিং অ্যান্ড টেইলিং’। কিভাবে করবেন?

চলুন দেখে নেয়া যাক-

  • প্রথমে একটি বোলে পরিমাণমতো গরম হালকা কুসুম গরম পানি নিয়ে নিন। পানিতে শ্যাম্পু, তেল বা বডি ওয়াশ এই জাতীয় কিছু মেশাবেন না। এরপর হাতের কনুই দিয়ে পানির তাপমাত্রা শিশুর ব্যবহারের উপযোগী কিনা তা দেখে নিন। তাপমাত্রা ঠিক মনে হলে তুলা বা নরম সুতি কাপড় ভিজিয়ে ঠিক মতে চিপে নিয়ে বাচ্চার মুখ, নাক ও কান আলতোভাবে মুছে নিন। অন্য কাপড় দিয়ে চোখের চারপাশে বিশেষ করে চোখের কোণায় জমে থাকা ময়লা মুছে বের করে ফেলুন।

 

  • আলাদা কাপড় নিয়ে এরপর ঘাড়,হাত-পা বিশেষ করে তাদের ভাঁজে আলতোভাবে ভালো করে মুছে নিন। ভাঁজ বা ক্রিজ গুলো যদি ঠিক মত পরিষ্কার না হয় তাহলে সেখানে ইনফেকশন হতে পারে।

 

  • অন্য কাপড় দিয়ে এরপর তাদের পেছনে ও সামনে জেনিটাল এরিয়াতে ভালমতো মুছে নিন।

 

  • সম্পুর্ণ শরীর মোছার জন্য অবশ্যই পানি বদল করে নিতে হবে। সেই সাথে শরীরের বিভিন্ন অংশ মোছার জন্য আলাদা আলাদা কাপড় নিতে হবে। একই কাপড় দিয়ে সব পরিষ্কার করা যাবেনা। নাহলে স্কিন ইনফেকশন হওয়ার সুযোগ থাকে।

 

  • এরপর আলাদা নরম টাওয়াল দিয়ে শরীর দ্রুত মুছে ফেলুন।

 

  • চাইলে মাথা আলাদা ভাবে ধুয়ে নিতে পারেন।

 

  • ত্বকের চাহিদা অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন মনে করেন যে, একদমই ছোট বাচ্চাকে বার বার লোশন বা তেল দিয়ে দিতে হবে। কিন্তু আমাদেরকে মনে রাখতে হবে বার বার তেল বা লোশন দিয়ে শিশুর হাত-পা ঘষে মুছে দিলে স্কিনের ন্যাচারাল ময়েশ্চার নষ্ট হয়ে স্কিন অনেক বেশী ড্রাই করে ফেলে। তখন স্কিন ইরিটেট করে এবং চামড়া অনেক বেশী পরিমাণে উঠতে থাকে। অনেক সময় র‍্যাশ দেখা যায় । তাই সাধারণত হাত-পা মুছিয়ে দিয়ে কিংবা গোসলের পর লোশন বা তেল লাগিয়ে দিতে হবে। সেক্ষেত্রে ফ্রেগ্রেন্স ও প্যারাবেন ফ্রি প্রোডাক্ট ব্যবহার করা যায় তাহলে তা শিশুদের ত্বকের যত্নে সবচেয়ে ভালো।

  • ডায়াপার/ন্যাপি চেঞ্জিং রুটিন

আমাদের দেশে ডায়াপার বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ব্যবহারের ব্যাপারটা দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে মূলত এর অধিক শোষণ ক্ষমতার কারণে। আজকাল বাজারে অনেক রকম ডায়াপার দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু এখনো অনেকে তাদের বাচ্চাদের জন্য নরম কাপড়ের ন্যাপি ব্যবহার করতে পচ্ছন্দ করেন। এখন যেটাই ব্যবহার করা হোক না কেন সব সময় খেয়াল রাখতে হবে কোনটাই যেন লম্বা সময়ের জন্য পড়িয়ে না রাখা হয়। এতে বাচ্চাদের খুব সহজেই ঠান্ডা,জ্বর বা কাশি লেগে যেতে পারে। তাই সব সময় খেয়াল রাখতে হবে যেনো সময়মতো ডায়াপার বা ন্যাপি বদলানো যায়। ডায়াপার চেঞ্জ এর সময় পায়ুপথ এবং এর আশেপাশের ভাঁজে নরম কাপড় কিংবা বেবী ওয়াইপ্স দিয়ে ভালো মত পরিষ্কার করে নিতে হবে। সরাসরি সাবান এইসব সেনসিটিভ জায়গায় ব্যবহার করবেন না। অনেক সময় শিশুদের স্কিনে এসব জায়গায় ডায়াপার র‍্যাশ দেখা যায়। তাই সবচেয়ে ভালো হয় ডায়াপার র‍্যাশ ক্রিম বা পেট্রোলিয়াম জেলী ব্যবহার করা। এতে স্কিন সফট থাকবে স্কিনে কোন রেডনেস বা ইরিটেশন হবে না।

  • তেল মালিশ করা

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে তেল মালিশ করার বিষয়টি বেশ উপকারী বলে মনে  করা হয়। জন্মের পর শরীরে তাপমাত্রার তারতম্যের কারণে কিংবা অসুস্থতায় অনেক সময় হাত-পা কামড়াতে শুরু করে। প্রতিদিন শিশুকে গোসল করানোর আগে নারিকেল তেল কিংবা অলিভ অয়েল কিংবা মাইল্ড বেবি ম্যাসাজ অয়েল ব্যবহার করতে হবে। মালিশ করলে বাচ্চাদের শরীরে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং রাতে ঘুম ভালো হয়।

  • নরম সুতি কাপড় ব্যবহার করা

একদম ছোট বাচ্চা বা নবজাতকদের পোশাকের ব্যপারে সব সময় সচেতন থাকতে হবে। খুব বেশী আটোশাটো, নকশা করা কাপড় পরানো যাবে না। এই ধরনের কাপড় ত্বকে ইরিটেশন তৈরি করে স্কিনে র‍্যাশ বা অ্যালার্জির মত সমস্যা হয়। তাদের কাপড় সব সময় হালকা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিলে সবচেয়ে ভালো।

  • অল্প কিছু সময়ের জন্য হালকা রোদে নেয়া

এই সময় যদি প্রতিদিন হালকা রোদে কিছুক্ষণ নেয়া যায় তাহলে রোদ থেকে আসা ভিটামিন ডি শিশুদের হার পুনর্গঠনে সাহায্য করে। গায়ে যদি কোন ব্যাথা থাকে সেই থেকে কিছুটা আরাম পাওয়া যায়। তবে খুব বেশী করা রোদে রাখা যাবেনা। সকালের হালকা মিষ্টি রোদ লাগিয়ে নিলেই হবে।

সন্তানের যত্নে বাবা-মা কখনো ত্রুটি রাখতে চান না। তারা চান তাদের সেরাটাই সন্তানকে দিতে। রীতি-রেওয়াজ এবং এমন অনেক নিয়ম আছে যা অনেক আগে থেকেই শিশুর যত্নে ব্যবহার হয়ে আসছে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এতেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। নতুন এই পরিবর্তনের সাথে সাথে শিশুর যত্নে কিছু নিয়ম মেনে চললেই শিশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে। এবং অন্যান্য সহজ সংক্রমক রোগ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। যত্নে থাকুক আপনার ছোট্ট সোনামণি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *